অনুশাসন না স্বাধীনতা: কোন বাংলাদেশ বেছে নেবেন নারী ভোটাররা?
শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ৬:৩৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের অর্ধেকেরও বেশি ভোটার এখন নারী।
এই বিপুল নারী জনসংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, আসন্ন নির্বাচনে রাষ্ট্রের দিকনির্দেশ ঠিক করে দেওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কঠোর ধর্মীয় ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীর উত্থান, নারীর পোশাক ও চলাফেরা নিয়ে হামলা, খেলাধুলা বন্ধ করে দেওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় কটূক্তি এবং সামাজিক বিচারের নামে অপমান–সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন আর কেবল ‘রাজনীতি’তে সীমাবদ্ধ নেই; এটি নারীদের অস্তিত্ব ও মর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
গত দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীদের ফুটবল ম্যাচ স্থগিত বা বাতিল, মাঠে হামলা, নারী উদ্যোক্তাদের শো-রুম উদ্বোধন ঘিরে হুমকি–এগুলো একই প্রবণতার অংশ, যেখানে নারীর জনসম্মুখে উপস্থিতিকেই ‘ধর্মবিরোধী’ বা ‘অশ্লীলতা’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মীয় উসকানি, কটূক্তি ও চরিত্রহননের মাধ্যমে নারী সাংবাদিক, কর্মী, ছাত্রনেত্রী ও সেলিব্রিটিদের টার্গেট করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নিলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর চাপ নারীদের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। গ্রাম থেকে শহর, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মহানগর—সবখানেই নারী ভোটার এখন আর নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ নন; বরং অনেক কেন্দ্রে তারা পুরুষ ভোটারের সমান বা সামান্য এগিয়ে। সংখ্যাগত এই শক্তি সত্ত্বেও প্রার্থী তালিকায় নারীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো কম। বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এবারও কোনো নারীকে মনোনয়ন দেয়নি, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতাদের আপত্তি, ধর্মীয় চাপ এবং পুরুষতান্ত্রিক দলীয় কাঠামোকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে মাঠে নারীর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যে আক্রমণাত্মক অবস্থান দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী বাছাইয়ে নারীদের বঞ্চিত করে আসলে একই মানসিকতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। নারীকে ভোটার হিসেবে দরকার, কিন্তু নীতিনির্ধারণের টেবিলে তাদের উপস্থিতি চাই না—এমন বাস্তবতায় নারী ভোট এখন তীব্র বৈপরীত্যের মুখে দাঁড়িয়ে।
এই প্রেক্ষাপটে উদার, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিগুলো নারী ভোটারদের উদ্দেশ করে বলছে, এবারকার নির্বাচন নারীদের জন্য শুধু সরকার বাছাই নয়, বরং “কোন বাংলাদেশ” তারা দেখতে চান—তারই এক ধরনের গণভোট। একদিকে আছে এমন বাংলাদেশ, যেখানে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের নামে নারীদের পোশাক, চলাফেরা, শিক্ষা ও কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, জনপরিসরে তাদের উপস্থিতি সীমিত রাখা হয় এবং পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যাকে ধর্মের নামে চাপিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে আছে এমন বাংলাদেশ, যেখানে নারী নিজের বিশ্বাস ও আচার পালন করেও সমান নাগরিক হিসেবে সিদ্ধান্ত নেবে—কোথায় কাজ করবে, কীভাবে চলবে, কাকে ভোট দেবে এবং কীভাবে নিজের অধিকার দাবি করবে।
নারী অধিকারকর্মীরা মনে করেন, সাম্প্রতিক ধর্মীয় মিছিল, ফতোয়ামুখী বক্তব্য, নারীবিরোধী প্রোপাগান্ডা এবং সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণাচর্চা—সব মিলিয়ে নারীদের সামনে দুই ধরনের পথ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথম পথটি পুরনো; সেখানে “সম্মান” আর “ধর্ম” রক্ষার নামে নারীদের চুপ থাকতে, পর্দার আড়ালে থাকতে এবং পুরুষের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে বলা হয়। দ্বিতীয় পথটি, যেখানে নারী তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেই শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি ও পরিবারে সমান অধিকার দাবি করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এ নির্বাচনে নারী ভোটারদের আচরণ শুধু ফলাফলের হিসাব বদলাবে না, ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। নারী ভোট যদি এমন প্রার্থী ও দলগুলোর দিকে যায়, যারা নারীর নিরাপত্তা, ডিজিটাল সহিংসতা রোধ, কর্মক্ষেত্রে সমতা, সমান মজুরি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকারবদ্ধ, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে আইন ও নীতিতে পরিবর্তন আনার চাপ তৈরি হবে। বিপরীতে, যদি নারীরা পরিবার বা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপে সেই সব শক্তিকেই ভোট দেন যারা প্রকাশ্য বা নীরবে নারীর স্বাধীনতার বিরোধিতা করে, তবে সহিংসতা, সামাজিক বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক অদৃশ্যতাই অব্যাহত থাকবে।
এই পরিস্থিতিতে প্রগতিশীল মহল স্পষ্ট ভাষায় বলছে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে নারীদেরই—তারা কি কেবল “সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসন” নামে প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর ভেতর আবদ্ধ থাকবেন, নাকি নিজস্ব আত্মমর্যাদা, অধিকার ও নাগরিক মর্যাদাকে সামনে রেখে স্বাধীনভাবে সমাজে নিজেদের জায়গা আরও শক্তিশালী করবেন। ভোট তাদের হাতে; সেই ভোট এখন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের নয়, বরং নারীদের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের হাতিয়ার।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
২২৩ বার পড়া হয়েছে
