বাংলাদেশ-ভারত সামরিক উত্তেজনা: সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সমীকরণে ঝুঁকিতে দুই প্রতিবেশী
রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৯:৪১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সাম্প্রতিক এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে সামরিক শক্তির ফারাক এখনো স্পষ্ট।
ভারতের সামরিক বাজেট যেখানে বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং পাকিস্তানের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার, সেখানে বাংলাদেশের ব্যয় ৩–৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় দেশটি কৌশলগতভাবে প্রতিরক্ষামুখী ও অ্যাসিমেট্রিক প্রতিরোধ–ধারণার ওপর নির্ভরশীল থেকে গেছে। তবু সীমিত পরিসরের ‘সার্জিক্যাল অপারেশন’ বা আকস্মিক হামলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আগের মতো সহজ লক্ষ্য হিসেবে দেখার সুযোগ আর নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর আওতায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণে গতি এসেছে। সেনাবাহিনীতে নতুন ডিভিশন, মেকানাইজড ইউনিট, গাইডেড রকেট–মিসাইল, ড্রোন ও বিশেষ বাহিনীর সক্ষমতা যোগ হওয়ায় সীমান্ত প্রতিরক্ষা ও পাল্টা আঘাতের পরিসর বেড়েছে। নৌবাহিনীর সাবমেরিন, গাইডেড–মিসাইল ফ্রিগেট ও উপকূলীয় অ্যান্টি–শিপ মিসাইলের সমন্বয়ে বঙ্গোপসাগরে সি–ডিনায়াল কনসেপ্ট চালু হচ্ছে, আর বিমান বাহিনী নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের সমন্বয়ে সীমিত আকাশ–প্রতিরক্ষা ও স্ট্যান্ড–অফ স্ট্রাইকের সক্ষমতা গড়ে তুলছে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত উত্তর–পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে নতুন সামরিক ঘাঁটি, গ্যারিসন ও লজিস্টিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, যা বাংলাদেশকে ঘিরে এক ধরনের ‘স্ট্র্যাটেজিক শিল্ড’ তৈরির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিলিগুড়ি করিডরকে সামনে রেখে উত্তরবঙ্গ–ঘেঁষা এলাকায় ভারতীয় বাহিনীর উপস্থিতি ও প্রস্তুতি বাড়ায় সীমান্তজুড়ে নজিরবিহীন সামরিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে বাংলাদেশের কৌশলগত মহলে।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—যদি পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও ভারত সীমিত মাত্রার কোনো “সার্জিক্যাল অপারেশন” চালায়, তাহলে এর সামরিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত কতদূর গড়াতে পারে। ভারতীয় সামরিক তত্ত্বে সার্জিক্যাল অপারেশন বলতে সাধারণত সীমান্তের কাছে কোনো ‘হাই ভ্যালু’ লক্ষ্য—যেমন কথিত সন্ত্রাসী ঘাঁটি, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, অস্ত্র ডিপো বা নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনায় দ্রুত, সীমিত, উচ্চনির্ভুল আঘাতকে বোঝানো হয়, যা বিমান হামলা বা স্পেশাল ফোর্স রেইডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিযানকে দিল্লি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কূটনৈতিক ও সামরিক “মরাল বুস্টার” হিসেবে তুলে ধরেছে, তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই সূত্র প্রয়োগ করলে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ অনেক জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করছেন দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশি সামরিক বিশ্লেষক মহলের একাংশের মতে, সীমান্তের কাছে কোনো সামরিক ঘাঁটি, রাডার স্টেশন বা ট্যাকটিক্যাল লজিস্টিক নোডে ভারত যদি সীমিত হামলা চালায়, তাহলে তাৎক্ষণিক ক্ষতি সামরিকভাবে সীমিত হলেও এর রাজনৈতিক ও জনমত–নির্ভর মূল্য অনেক বড় হবে। ঢাকা এমন পরিস্থিতিতে কেবল কূটনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন ধারণাকে অবাস্তব বলা হচ্ছে; বরং সীমান্ত–ঘেঁষা ভারতীয় ফরওয়ার্ড পোস্ট, সেতু, সড়ক ও নতুন গ্যারিসনগুলো বাংলাদেশি আর্টিলারি, গাইডেড রকেট ও ড্রোনের বৈধ পাল্টা–টার্গেটে পরিণত হতে পারে বলে বিভিন্ন ওপেন–সোর্স বিশ্লেষণে উল্লেখ এসেছে।
বঙ্গোপসাগরেও পরিস্থিতি জটিল রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের অ্যাসিমেট্রিক নৌ–কৌশল সম্পর্কিত সাম্প্রতিক নথিতে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধাবস্থায় উপকূল ঘেঁষা সমুদ্রপথ, বন্দর–অভিগমন চ্যানেল ও অফশোর স্থাপনায় মাইন, সাবমেরিন ও অ্যান্টি–শিপ মিসাইল ব্যবহার করে ভারতীয় নৌ ও বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলে ঝুঁকি তৈরির কনসেপ্ট নিয়ে কাজ চলছে। এতে একদিকে ভারতের পূর্ব উপকূলে সামরিক ও বাণিজ্যিক সরবরাহ–লাইন চাপের মুখে পড়তে পারে, অন্যদিকে বৈশ্বিক শিপিং রুটে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহল দ্রুত হস্তক্ষেপে যেতে বাধ্য হবে—যা দুই পক্ষেরই কৌশলগত লক্ষ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
তবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে শক্তির পার্থক্য যে এখনো বিশাল, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। আন্তর্জাতিক সামরিক শক্তি–সূচকে ভারত যেখানে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে অবস্থান করছে, সেখানে পাকিস্তান ১০–১৫ এবং বাংলাদেশ ৩০–৫০ নম্বরের ঘরে ঘোরাফেরা করছে। স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্ল্যাটফর্ম সংখ্যা, প্রতিরক্ষা বাজেট, শিল্পভিত্তি ও প্রযুক্তিগত আধুনিকতার দিক থেকে ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ওপর সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার ধরে রেখেছে; সেই বাস্তবতায় পূর্ণাঙ্গ কনভেনশনাল যুদ্ধে ভারতের সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়, স্বীকার করছে দেশের ভেতরের অনেক সামরিক–কূটনৈতিক বিশ্লেষণ।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে সীমিত আকারের হলেও কার্যকর ডিটারেন্স বা নিরুৎসাহমূলক ক্ষমতা গড়ে তোলা। অর্থাৎ, যে কোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ ভারতের জন্য রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে এতটা ব্যয়বহুল করে তোলা, যাতে দিল্লি আগেই দু’বার চিন্তা করতে বাধ্য হয়। সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি, আঞ্চলিক জোট–সমীকরণ, চীন–তুরস্ক–পাশ্চাত্য অংশীদারদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা–সহযোগিতা এবং সীমান্ত অর্থনীতি—এসবকেও বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে।
অবশ্য অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, দু’দেশের মধ্যে “সার্জিক্যাল অপারেশন” ধরনের সামরিক অভিযানের বাস্তব ঝুঁকি এখনো তুলনামূলক কম। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন–ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পাকিস্তান–ভারত উত্তেজনা, সিলিগুড়ি করিডরের ভৌগোলিক ভঙ্গুরতা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নজরদারি—সব মিলিয়ে ভারত–বাংলাদেশ সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের যেকোনো পদক্ষেপকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদে ভারতের নিজের নিরাপত্তা–নীতির জন্যই প্রতিকূল করে তুলেছে। তবু সীমান্তে ক্রমাগত সামরিক উপস্থিতি, রাজনৈতিক বক্তব্য ও মিডিয়ায় কঠোর ভাষ্য—এসব মিলে “দুর্ঘটনাজনিত সংঘর্ষ” বা সীমিত আঘাত–প্রতিআঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না; আর সেই সম্ভাবনাই আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
২০০ বার পড়া হয়েছে
