বিজয়ের মাসেও কুষ্টিয়া-৪ আসনে বিএনপির জয় নিয়ে শঙ্কা, সুবিধায় জামায়াত
মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৭:১৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মহান বিজয়ের মাসে কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে বিএনপির বিজয়ের হিসাব মিলছে না। দলীয় মনোনয়নে সন্তুষ্ট না হতে পারায় বিভক্তিই পরাজয়ের কারণ হতে পারে বলে একাধিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এক সময় আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাটি বলে পরিচিত হলেও পরবর্তীতে বিএনপি আধিপত্য বিস্তার করে। নানা পালাবদলের পরও বিএনপির জনপ্রিয়তা থাকলেও দলের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ শঙ্কায় ফেলেছে। মনোনয়ন অসন্তোষ্টির কারণে তরুণ ভোটারও বিভ্রান্ত। এতে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে জামায়াত। স্থানীয়দের বেশিরভাগ নেতাকর্মী ও সমর্থকরাই তরুণ নেতা হিসেবে শেখ সাদীকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান। এছাড়া বয়স বিবেচনায় অন্যদের তার প্রতি সমর্থন দেওয়ার পক্ষেও মত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মীদের।
জাতীয় সংসদের ৭৮ নম্বর আসন কুষ্টিয়া-৪ গঠিত কুমারখালী ও খোকসা উপজেলার দুটি পৌরসভা এবং ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ১৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে কুমারখালী উপজেলায় ভোটার প্রায় দুই লাখ ৮৬ হাজার এবং খোকসায় এক লাখ ১৬ হাজারের বেশি। পুরুষ ও নারী ভোটারের অনুপাত প্রায় সমান।
খুলনা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী আসন হিসেবে কুষ্টিয়া-৪ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে যে দল জয়লাভ করে, সাধারণত খুলনা বিভাগে সেই দলের ফলাফলও ইতিবাচক হয়। ভৌগোলিকভাবে রাজবাড়ী, পাবনা ও মাগুরা জেলার সংযোগস্থলে অবস্থান করায় এখানকার রাজনৈতিক উত্তাপ আশপাশের জেলাগুলোতেও প্রভাব ফেলে।
অতীত নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই আসনে কোনো দল বা ব্যক্তি দীর্ঘদিন একক আধিপত্য বজায় রাখতে পারেনি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও জামায়াতের সঙ্গে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ১৯৯৬ সালে অল্প ভোটের ব্যবধানে বিএনপি জয় পায়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয়ী হয়। ২০০৮ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট আওয়ামী লীগের কাছে পরাজিত হয়। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন ছিল একতরফা বা অংশগ্রহণহীন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ডামি প্রার্থী জয়লাভ করেন।
আগামী ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি থেকে প্রার্থী করা হয়েছে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীকে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কুমারখালী উপজেলা নায়েবে আমির ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আফজাল হোসাইন। এছাড়া ইসলামি আন্দোলন থেকে আনোয়ার খান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে ফজলে নূর ডিকো এবং গণঅধিকার পরিষদ থেকে শাকিল আহমদ তিয়াস প্রার্থী হয়েছেন।
বিএনপি হাইকমান্ড গত ৩ নভেম্বর সারাদেশে ২৩৭টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে। ঘোষণার পরপরই কুষ্টিয়া-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধ শুরু হয়। কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র নুরুল ইসলাম আনছার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে মশাল মিছিল, সড়ক অবরোধ, মানববন্ধনসহ একাধিক কর্মসূচি পালন করেন। এতে বিএনপির নেতাকর্মীরা কার্যত চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম আনছার, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক, এশিউর গ্রুপর চেয়ারম্যান, কুষ্টিয়া জেলা সমিতি ঢাকার সভাপতি শেখ সাদী এবং কৃষক দলের কেন্দ্রীয় নেতা হাফেজ মঈনউদ্দীনের অনুসারীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। এর ফলে বিএনপির নেতাকর্মীরা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। এদের মধ্যে শেখ সাদী সর্বোচ্চ সংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে শোডাউন করে কুমারখালী-খোকসায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছেন। তার নাম এখন সবার মুখেমুখে।।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরেই এই আসনে সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। কুষ্টিয়ায় ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় ছাত্রশিবিরের শক্ত ঘাঁটি গড়ে উঠেছে এই এলাকায়। অতীত আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকার কারণে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে বলে দাবি দলটির নেতাদের।
জামায়াত প্রার্থী আফজাল হোসাইনকে ঘিরে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত গণসংযোগ চলছে। স্থানীয়দের একটি অংশ তাকে ইতোমধ্যেই জনপ্রিয় নেতা হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জামায়াত এ আসনে বড় ধরনের ফলাফল করতে পারে।
ইসলামি আন্দোলন ও অন্যান্য ছোট দলগুলোর কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে সীমিত। দলীয় কাঠামো ও পরিচিতির অভাবে তাদের প্রার্থীদের প্রচারণা তেমন চোখে পড়ছে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়ে হতাশা রয়েছে। অনেকের মতে, সময়মতো সমাধান না হলে এই দ্বন্দ্ব নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের আগে যদি বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে, তবে কুষ্টিয়া-৪ আসনে তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কুমারখালীর ব্যবসায়ী কাজল বললেন, বিএনপি কামড়াকামড়িতেই হারবে। এবার খুব ভালো সুযোগ ছিলে। কিন্তু মনোনয়নই ম্যারে দেছে। মনে হয় না জামায়াতের সাথে প্যারে উঠতি পারবে। জামায়াত খুব শিয়ানা দল। কানেকশন খুব ভালো। আওয়ামী লীগের ভোটও ওই দিকে চলে যাবে। তবে শেখ সাদীকে মনোনয়ন দিলে সব হিসাব বদলে য্যাতে, কারো মন খারাপ করার সুযোগ ছিলে না। ইবার দলের হিসাব ঠিক নাই।
খোকসা বাজারের ব্যবসায়ী ইলিয়াস বললেন, জামায়াত এখন সেই ফর্মে আছে। ফুরফুর করে ওরতেছে। বিএনপিতে ঠেলাঠেলি। ওয়েরেতো আর এসবনি। ভালোই গুছায়ে ফেলেছে। এখন সুময় ভালো না। তরুণদের জুয়ার যাচ্ছে। সেইডে দেখলিই বিএনপির জন্যি ভালো হতে।
তরুণ ভোটার সিদ্দিকের বক্তব্য- তরুণ হিসেবে শেখ সাদীকে মনোনয়ন দেওয়া দরকার। তিনি সৎলোক। টাকা-পয়সার অভাব নেই। হাট-ঘাট দখল এবং টেন্ডারবাজী হবে না। আমার এই কথা সাথে সবাই একমত। আপনি দুই উপজেলার ভোটারদের সাথে কথা বলেন, সবাই আমার এই কথাকেই সমর্থন দেবে।
বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত কেউই মনোনয়ন প্রসঙ্গে কথা বলতে চান না। দলীয় পদ হারানোর আতংকে আছেন তারা। দলের পক্ষে কাজ করতে চান তারা। অন্য কোনো দিকে তারা নেই। দলকেই দলের বিষয়টি বুঝতে হবে। তাদের বুঝের সাথে দল নেই। তাই কোনো মন্তব্য করতে চান না।
২২৫ বার পড়া হয়েছে
